এই সময় ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তুরে হাওয়ার কনকনে আমেজ নিয়ে কলকাতায় ঢুকে পড়েছে শীত। আর শীত এলেই তো শুষ্ক রুক্ষ ত্বকের যত্ন নিতে যার কথা সব থেকে মনে পড়ে সেটা তো হল বোরোলিন ৷ আর এই ক্রিমকে ঘিরে রয়েছে আকর্ষণীয় গল্প ৷ 'অ্যারোমেটিক অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন ...’ গত শতাব্দীর এই জিংলটি কে ভুলতে পারে । এমন একটি ক্রিম যা শুধুমাত্র বিউটি প্রোডাক্ট হিসেবে পরিচিত নয় বরং প্রায়ই প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সে যার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত । ব্রিটিশ আমলে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য স্বদেশী আন্দোলনের সময় আত্মপ্রকাশ করেছিল এই ক্রিম । বোরোলিনের বয়স 92 বছর কিন্তু আজও এটি অনেক ভারতীয় বাড়িতে আলাদা জায়গা বজায় রেখে চলেছে। বোরোলিনের আত্মপ্রকাশের পিছনে রয়েছে কলকাতার গৌর মোহন দত্তের ভূমিকা । 1929 সালে , গৌর মোহন দত্ত মানুষের জন্য একটি ভারতীয় অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম তৈরির সিদ্ধান্ত নেন , যা প্রত্যেক ভারতীয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে । তখন ছিল ব্রিটিশ শাসন আর দেশে তখন শুধুমাত্র বিদেশী এবং দামি ক্রিম পাওয়া যেত। আসুন জেনে নেওয়া যাক ... কে ছিলেন গৌর মোহন দত্ত গৌর মোহন দত্ত বিদেশী পণ্যের আমদানিকারক ছিলেন । কিন্তু তারপর তিনি স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতকে সাহায্য করার সর্বোত্তম উপায় হল - এটিকে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা । তাই তারা এমন পণ্য তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যা মানসম্মত বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে । কিন্তু এ কাজটা সহজ ছিল না । অনেকে তাঁর উদ্যোগের বিরোধিতা করলেও গৌর মোহন দত্ত হাল ছাড়েননি । ভারতকে স্বাধীন ও স্বনির্ভর করার স্বপ্নকে হৃদয়ে রেখে তিনি নিজ বাড়িতে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় পণ্য তৈরি শুরু করেন। তাদের মধ্যে একটি ছিল এই বোরোলিন ক্রিম যা একটি সবুজ টিউবে আসে । দত্ত মহাশয় 1929 সালে এটিকে বাজারে নিয়ে আসেন । বোরোলিনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির নাম জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস । জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস পরিচিত জনগণের বোরোলিন নামেও । বোরোলিন শব্দের প্রথম অংশটি হল বোরো, যা বোরিক পাউডার থেকে উদ্ভূত যার একটি অ্যান্টি-সেপটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে । দ্বিতীয় অংশ হল ওলিন ... এই শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ওলিয়ন ( oleon ) থেকে , যার অর্থ তেল । বলা হয়ে থাকে যে , সরকারী কোষাগারের এক টাকাও কখনও এই কোম্পানির কাছে পাওনা ছিল না। ক্রিমটির ফর্মূলা কখনও গোপন রাখা হয় নি ৷ প্রায়ই কোম্পানিগুলি তাদের পণ্যের ফর্মূলা গোপন রাখে যাতে অন্য কেউ একই পণ্য তৈরি করতে না পারে। কিন্তু জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস কখনও ' বোরোলিন ' তৈরির এই ফর্মূলা গোপন রাখেনি। বোরোলিন অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম অ্যান্টিসেপটিক বোরিক অ্যাসিড , অ্যাস্ট্রিনজেন্ট এবং সানস্ক্রিন জিংক অক্সাইড এবং ইমোলিয়েন্ট ল্যানোলিন ব্যবহার করে । বোরোলিন কাটা , ঠোঁট ফেটে যাওয়া , রুক্ষ ত্বক এবং সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় । মহান বিপণন ব্যবস্থা ছাড়াই এর নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছিল ৷ সেই সময়টা, বড় আকারের বিজ্ঞাপনের যুগ নয় , তা স্বত্তেও বোরোলিন সক্ষম হয়েছিল পণ্য হিসেবে নিজের একটা শক্তিশালী পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে । বোরোলিন শীঘ্রই সারা দেশের মানুষের প্রিয় ক্রিম হয়ে ওঠে । স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতে , কাশ্মীরিরা হিমশীতল এবং শুষ্ক ত্বক থেকে মুক্তি পেতে এটি ব্যবহার করত এবং দক্ষিণ ভারতের লোকেরা তাপ থেকে বাঁচতে এটি ব্যবহার করত । বোরোলিন প্রতিটি ত্বকের ধরনের জন্য উপযুক্ত একটি ক্রিম। এটি হয়ে ওঠে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক ৷ আত্মপ্রকাশের পর থেকে বছরগুলি পেরিয়ে গেলে , বোরোলিন ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা একটি দেশে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বোরোলিন সম্পর্কে কিছু আকর্ষণীয় উপাখ্যান রয়েছে। কথিত আছে যে বোরোলিনের জনপ্রিয়তার খবর পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং অভিনেতা রাজকুমারের কাছে এলে তাঁরাও এটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পৃথক প্যাকেজিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় , যুদ্ধের কারণে যে অভাব সৃষ্টি হয়েছিল ,সেই সময়ে প্রচলিত প্যাকেজিং না করে তখন বোরোলিন উপলব্ধ পাত্রে প্যাকেজ করা হয়েছিল । পণ্যের সত্যতা সম্পর্কে গ্রাহকের মনে সন্দেহ দূর করার জন্য , এই জিনিসটি প্যাকের নীচে কিছু কথা মুদ্রিত হয়েছিল। তাতে লেখা থাকত .." যুদ্ধের জরুরি অবস্থার কারণে মূল প্যাকিং পরিবর্তন করা হয়েছে , উপাদানের পরিমাণ এবং গুণমান অপরিবর্তিত রয়েছে । " দেশের স্বাধীনতায় বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে এক লক্ষ বোরোলিন ৷ 1947 সালের 15 আগস্ট ভারত যেদিন দেশ স্বাধীন হয় , সেদিন জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস এই আনন্দ উপলক্ষ্যে সাধারণ জনগণের জন্য বিনামূল্যে 1,00,000 বোরোলিন টিউব বিতরণ করেছিল । 1947, সালের 15 অগস্ট কলকাতার দুটি সংবাদপত্রে এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল । জিডি ফার্মাসিউটিক্যালসের ভারতে দুটি অত্যাধুনিক জিএমপি ( গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস ) প্রত্যয়িত উৎপাদন ইউনিট রয়েছে । কোম্পানির দাবি, প্রতিটি পণ্যই অত্যন্ত যত্ন সহকারে তৈরি করা হয় । এগুলি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সুবিধাযুক্ত , যেখানে বর্তমান কর্মীরা পণ্যের গুণমানের প্রতি গভীর ভাবে নজর রাখছে । 2003 সালে চালু হয়েছিল সুথল ৷ বহু বছর ধরে কোম্পানিটি শুধুমাত্র একটি পণ্য ' বোরোলিন ' নিয়েই রয়ে গিয়েছিল। জিডি ফার্মা 90 এর দশকের শেষ দিকে ' এলেন হেয়ার অয়েল ' বাজারে নিয়ে আসে । 2003 সালে, কোম্পানি ‘ সুথল ’ নামে একটি অ্যান্টিসেপটিক তরল নিয়ে আসে। ' সুথল ' গ্রীষ্মের মরসুমে কোম্পানির বিক্রি বাড়ায় এবং শীতের মরসুমে ' বোরোলিন ' ক্রিম বেশি বিক্রি হয়। জিডি ফার্মাসিউটিক্যালস আজ যেসব পণ্য বিক্রি করে তারমধ্যে রয়েছে - বোরোলিন ক্রিম , বিও লিপস , রুকশা হ্যান্ড ওয়াশ , রুকশা হ্যান্ড স্যানিটাইজার , এলাইন , সুথল, পেনরব এবং নপ্রিক্স ।
from Bengali News, Bangla News, বাংলা সংবাদ, বাংলা নিউজ, News in Bengali, কলকাতা বাংলা খবর - Ei Samay https://ift.tt/3Eq23FM
No comments:
Post a Comment
Your Message Will Riplied Within 24 Hours.
Thank You.